মুক্তচিন্তা সমাজ

পর্দার আড়ালে পরিচয়: রাষ্ট্রের সামনে নাগরিকের দৃশ্যমানতার প্রশ্ন (পর্ব-২)

ইতিহাসে এমন ক্রীতদাসও ছিল, যারা ক্রীতদাসপ্রথার পক্ষেই দাঁড়িয়েছিল। দীর্ঘদিন শৃঙ্খলে থাকলে কেউ কেউ শৃঙ্খলকেই অলংকার বলে ভাবতে শেখে। আজও কিছু নারী নিজেদের বন্দিত্বকে স্বাধীনতা, নিজেদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়াকে অধিকার এবং নারীবিদ্বেষী প্রথার কাছে আত্মসমর্পণকে ধর্মীয় মর্যাদা বলে প্রচার করছে।

সব শৃঙ্খল পুরুষেরা এসে নারীর হাতে পরায় না। কিছু নারী নিজেরাই শৃঙ্খল পরে, তারপর অন্য নারীদেরও সেই শৃঙ্খল পরানোর জন্য লড়াই করে। এরা শৃঙ্খল ভাঙতে চায় না, শৃঙ্খল পরেই রাষ্ট্র, সমাজ এবং আধুনিক সভ্যতাকে নিজেদের সামনে নত করতে চায়।

জাতীয় পরিচয়পত্র কোনো ধর্মীয় অনুদান নয়। এটি একজন নাগরিকের দৃশ্যমান, যাচাইযোগ্য পরিচয়ের সরকারি প্রমাণ। পরিচয়পত্র চাইলে মুখ দেখাতে হবে। ছবি তুলতে হবে। মুখ গোপন রেখে জাতীয় পরিচয়পত্র দাবি করার কোনো অধিকার কারও নেই।

ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে শুধু একটি জৈবিক ছাপ পাওয়া যায়; মানুষটিকে দৃশ্যত শনাক্ত করার জন্য মুখ প্রয়োজন।

রাষ্ট্র কেন আন্দাজ করে বুঝবে তুমি কে? তুমি যখন পরিচয়পত্র চাইছ, তখন তোমাকেই প্রমাণ করতে হবে তুমি কে।

ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিচয় ব্যক্তিগত কল্পনা দিয়ে চলে না। কোনো ধর্মীয় পোশাক, প্রথা বা নিষেধাজ্ঞা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও পরিচয় যাচাইয়ের নিয়মের ঊর্ধ্বে নয়।

মুখ না দেখালে পরিচয় যাচাই হবে না। পরিচয় যাচাই না হলে পরিচয়পত্রও নয়।

নারীর লড়াই হওয়া উচিত নিজেকে অদৃশ্য করার জন্য নয়, দৃশ্যমান হওয়ার জন্য; নিজের কণ্ঠ স্তব্ধ করার জন্য নয়, আরও জোরে কথা বলার জন্য; শৃঙ্খলকে অধিকার ঘোষণা করার জন্য নয়, শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলার জন্য।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও একজন সংসদ সদস্য মৌলবাদী গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামীর কালো কাপড়ে ঢাকা নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা কারা? আপনাদের তো চিনলাম না।”

এতেই উত্তপ্ত হয়ে পড়ে মৌলবাদী গোষ্ঠীর ধর্ম ও দ্বীনি চেতনার লিঙ্গ। কিন্তু এমন প্রশ্ন বেশ যৌক্তিক। এসব নারিরা রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার ব্যবস্থায় কেউই দাস হয়ে জন্মায় না। কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারা চিন্তায় ও মননে দাসত্ব বরণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *